ঢাকা ০৫:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
খবর ধারা :
বড়লেখা পৌরসভা চালায় আওয়ামী লীগ! যুবলীগ সভাপতি জালালের ১২ লাখ টাকা কেলেঙ্কারি ফাঁস তফসিলই হয়নি, তারিখও অজানা — এরই মধ্যে বড়লেখায় মেয়র প্রার্থীর ১৫ দফা ইশতেহার ঘোষণা, জনমনে প্রশ্ন শাহবাজপুরে ৩৬০ মিটারের রাস্তায় ৭০ লাখের টেন্ডার: এলটিএমের আড়ালে কাজ পেলেন আওয়ামী লীগ নেতা শাহজাহান বড়লেখা পৌরসভা: বিএনপি আমলে কীভাবে কাজ পেলেন যুবলীগ নেতা শাহজাহান কমিশনার? সিঙ্গাপুর-ইন্দোনেশিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী ছাত্রদলের গলা টিপে ধরার ছবিটি ভুয়া, গুজব ছড়াচ্ছেন জাকির হোসেন ইউপি নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত নিয়ে ভাইরাল তথ্য ‘গুজব’ সম্পর্ক মেনে নেয়নি পরিবার, ২ মাস পর লাশ হলো সুফিয়ান | বড়লেখা রাজনগরে ৮ ফুট মাটির নিচে গৃহবধূর লাশ, স্বামীর স্বীকারোক্তিতে উদ্ধার জাফরের অপরাধ কী? ৭০০ টাকার বিতর্কে নিহতের স্ত্রীর ভুল স্বীকার, লাইভে ১৫ হাজার দেন জাফর ইকবাল |

জামায়াত নেতাকর্মী বলেই কি ৫ মাসেও গ্রেফতার হচ্ছেন না বড়লেখার জোড়া খুনের আসামীরা? খুনিরা প্রকাশ্যে, ভুক্তভোগীরা ফেরারি!

খবর ধারা নিজস্ব প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৮:৪১:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ ৩১ বার পড়া হয়েছে

জামায়াত নেতাকর্মী বলেই কি ৫ মাসেও গ্রেফতার হচ্ছেন না বড়লেখার জোড়া খুনের আসামীরা? খুনিরা প্রকাশ্যে, ভুক্তভোগীরা ফেরারি!

নিজস্ব প্রতিনিধি : ঘরের মূল ফটকে ঝুলছে মস্ত বড় একটা তালা। যে বাড়িটি চার মাস আগেও প্রবাসীর ঘরে ফেরার আনন্দে মুখরিত ছিল, সেখানে আজ শুধুই শ্মশানের নীরবতা।

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে আপন দুই ভাই কুয়েত প্রবাসী জামাল উদ্দিন ও কৃষক আব্দুল কাইয়ুমকে হত্যার পর চার মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বুকফাটানো আর্তনাদ আর আসামীদের অব্যাহত হুমকিতে আজ নিজের পৈত্রিক ভিটেমাটি ছেড়ে ফেরারি ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারটি। অথচ, যাদের নামে সুনির্দিষ্ট খুনের মামলা রয়েছে, সেই আসামীরা পুলিশের নাকের ডগায় বহাল তবিয়তে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এলাকায়। আইনের এমন উল্টো রথ আর প্রশাসনের নীরবতায় পুরো বড়লেখা জুড়ে এখন তীব্র ক্ষোভ আর হাহাকার।

প্রশ্ন উঠেছে আইন-শৃঙ্খলারক্ষা বাহিনীর চরম অবহেলা, রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা আর অপরাধীদের রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে কি তবে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন?

সরেজমিনে উপজেলার দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নের বিওসি কেছরীগুল এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক বুকফাটা হাহাকার ও ভুতুড়ে পরিবেশ। যে বাড়িটি চার মাস আগেও মানুষের আনাগোনায় মুখরিত ছিল, সেই বসতবাড়ির মূল ফটকে এখন ঝুলছে একটি বড় তালা। দিনদুপুরে বিওসি মাঠ গুদাম এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাত করে নৃশংসভাবে জোড়া খুনের শিকার হওয়া পরিবারটি আজ নিজেদের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুতেও মাথা গোঁজার সাহস পাচ্ছে না।

কুয়েত প্রবাসী জামাল উদ্দিন দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষ করে মাত্র কয়েক মাস আগে দেশে ফিরেছিলেন নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। কিন্তু আজ তার স্ত্রী ও সন্তানরা স্বজনদের হারিয়ে চরম মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

নিহতদের এক নিকটাত্মীয় অশ্রুভেজা চোখে এবং আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে এই প্রতিবেদককে বলেন, “যাদের চোখের সামনে নিজেদের মানুষগুলো নৃশংসভাবে খুন হলো, তারা আজ জীবন বাঁচাতে ফেরারি। খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর পুলিশ আমাদের ঘরছাড়া করে রেখেছে। এই মহিলা (নিহতের স্ত্রী) আমাদের কতটা মায়া করতেন, কত রান্না করে খাওয়াতেন! আজ তার স্বামী নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। আমরা কার কাছে বিচার চাইবো? এই দেশে কি গরিবের জন্য কোনো আইন নেই?”

মামলার এজাহার: ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা, ১৩ জনই জামায়াত নেতা

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিওসি কেছরীগুল এলাকায় সংঘটিত এই ধারাবাহিক সহিংসতা ও তিনটি পৃথক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বড়লেখা থানায় মোট ১৬ জনকে সুনির্দিষ্ট আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, আসামীদের মধ্যে ১৩ জনই স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী নেতা-কর্মী এবং বাকি ৩ জন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য।

গত ২৮ ডিসেম্বর বিকেলে, যখন বিওসি মাঠ গুদাম এলাকায় পূর্বশত্রুতার জের ধরে দুই পক্ষের বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের আসামীদের হাতে থাকা ধারালো রামদা ও লাঠিসোটা নিয়ে দুই ভাইয়ের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। মাথায় মারাত্মক জখম হওয়ায় জামাল ও কাইয়ুম ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। একই ঘটনায় প্রতিপক্ষের জমির উদ্দিন নামের একজন আহত হলে তাকে উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল সেখান থেকে পুলিশ থাকে গ্রেফতার করে। উক্ত মামলার আসামিরা হলেন- ১। কামাল আহমদ (৪০), পিতা- মৃত মতরুফ আলী, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ২। গ্রেফতারকৃত জমির আলী (৩৫), পিতা-মৃত আব্দুস ছবুর, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৩। এনাম উদ্দিন (২২), পিতা- মৃত মতরুফ আলী, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৪। তুতিউর রহমান দোয়েল (৫০), পিতা- মৃত মোদাচ্ছের আলী, সাং- বড়খলা, ৫। আব্দুল আজিজ (৩৮), পিতা- মৃত আব্দুস সুফান, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৬। সাইফুল ইসলাম (৩৫), পিতা- জয়নাল আবেদিন, সাং-বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৭। আব্দুল হামিদ (৪০), পিতা- মৃত আব্দুস শুকুর, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৮। জয়নাল আবেদিন (৫৬), পিতা- মৃত আব্দুল মজিদ, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৯। গ্রেফতারকৃত আব্দুল আলিম (২৬), পিতা- মৃত শফিক, সাং- গৌড়নগর, ১০। নানু মিয়া (৩০), পিতা- উস্তার আলী, সাং- পানিধার, ১১। জাহেদুর রহমান (৩৩), পিতা- মৃত ইসলাম উদ্দিন, সাং-মহদিকোনা, ১২। ফয়ছল আহমদ (৩৪), পিতা- আব্দুল হক, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ১৩। আলী হোসেন (২৭), পিতা- মৃত আব্দুল মালিক, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ১৪। অহিদ আহমদ (৪০), পিতা- মৃত আকবর আলী, সাং- উত্তরভাগ (কাঠালতলী উত্তর), ১৫। আব্দুল হক (৫২), পিতা- মৃত আব্দুস শুকুর, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ১৬। সমছুল ইসলাম (৩৬), পিতা-মৃত আব্দুস ছবুর, সাং- বিওসি কেছরীগুল, সর্ব থানা- বড়লেখা, জেলা- মৌলভীবাজার। গং ১০/১৫জন

নির্বাচন শেষ হলেও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় ফুঁসছে বড়লেখা :

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দেশে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন শেষ হলেও এই চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের মামলার আসামীদের গ্রেফতারে বড়লেখা থানা প্রশাসন ও স্থানীয় সিভিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো জবাবদিহিতা বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। মামলার পর দীর্ঘ ৪ মাস অর্থাৎ ১২০টিরও বেশি দিন পার হয়ে গেলেও আসামীদের একজনকেও ছুঁতে না পারা পুলিশের চরম অবহেলা, উদাসীনতা এবং পরোক্ষ পক্ষপাতিত্বকেই নির্দেশ করে। প্রশাসনের এমন রহস্যজনক নীরবতা এবং আসামীদের ক্ষমতার দাপটের কারণে পুরো বড়লেখা জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এলাকার সাধারণ মানুষ এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত।

বড়লেখা থানা পুলিশের দাবি ও বাস্তবতা :

মামলার দীর্ঘ স্থবিরতা ও আসামীদের গ্রেফতার না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান খান পূর্বের মতোই চিরাচরিত সুরে জানান, “নিহত দু’জন আপন দুই ভাই ছিলেন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের মাথায় আঘাত করা হয়েছিল এবং আমরা তাদের ঘটনাস্থলেই মৃত অবস্থায় পাই। ঘটনার পর থেকেই পুলিশ প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেফতারে কাজ করছে। আসামীদের গ্রেফতারে আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

তবে দীর্ঘ চার মাসেও কেন একজন আসামীকেও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলো না, কিংবা আসামীরা এলাকায় থাকা সত্ত্বেও কেন পুলিশ তাদের দেখছে না—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি। ওসির এই দাবি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত লক্ষ্য করা গেছে।

দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকুতি :

নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে, স্বজনদের হারিয়ে আজ ধুঁকে ধুঁকে মরছে অসহায় পরিবারটি। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো বিশেষ দলের কোটা ব্যবহার করে কেউ যেন পার পেয়ে যেতে না পারে। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক অবহেলার এই বিষাক্ত বেড়াজাল ছিন্ন করে অবিলম্বে এজাহারভুক্ত ১৬ আসামীকে দ্রুততম সময়ে গ্রেফতার করতে হবে। ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারটিকে তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটিতে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং এই বর্বরোচিত জোড়া খুনের দ্রুততম ট্রায়ালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আইনি শাস্তি (ফাঁসি) নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন মৌলভীবাজারের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ।

নিউজটি শেয়ার করুন

জামায়াত নেতাকর্মী বলেই কি ৫ মাসেও গ্রেফতার হচ্ছেন না বড়লেখার জোড়া খুনের আসামীরা? খুনিরা প্রকাশ্যে, ভুক্তভোগীরা ফেরারি!

আপডেট সময় : ০৮:৪১:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

জামায়াত নেতাকর্মী বলেই কি ৫ মাসেও গ্রেফতার হচ্ছেন না বড়লেখার জোড়া খুনের আসামীরা? খুনিরা প্রকাশ্যে, ভুক্তভোগীরা ফেরারি!

নিজস্ব প্রতিনিধি : ঘরের মূল ফটকে ঝুলছে মস্ত বড় একটা তালা। যে বাড়িটি চার মাস আগেও প্রবাসীর ঘরে ফেরার আনন্দে মুখরিত ছিল, সেখানে আজ শুধুই শ্মশানের নীরবতা।

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে আপন দুই ভাই কুয়েত প্রবাসী জামাল উদ্দিন ও কৃষক আব্দুল কাইয়ুমকে হত্যার পর চার মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বুকফাটানো আর্তনাদ আর আসামীদের অব্যাহত হুমকিতে আজ নিজের পৈত্রিক ভিটেমাটি ছেড়ে ফেরারি ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারটি। অথচ, যাদের নামে সুনির্দিষ্ট খুনের মামলা রয়েছে, সেই আসামীরা পুলিশের নাকের ডগায় বহাল তবিয়তে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এলাকায়। আইনের এমন উল্টো রথ আর প্রশাসনের নীরবতায় পুরো বড়লেখা জুড়ে এখন তীব্র ক্ষোভ আর হাহাকার।

প্রশ্ন উঠেছে আইন-শৃঙ্খলারক্ষা বাহিনীর চরম অবহেলা, রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা আর অপরাধীদের রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে কি তবে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন?

সরেজমিনে উপজেলার দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নের বিওসি কেছরীগুল এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক বুকফাটা হাহাকার ও ভুতুড়ে পরিবেশ। যে বাড়িটি চার মাস আগেও মানুষের আনাগোনায় মুখরিত ছিল, সেই বসতবাড়ির মূল ফটকে এখন ঝুলছে একটি বড় তালা। দিনদুপুরে বিওসি মাঠ গুদাম এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাত করে নৃশংসভাবে জোড়া খুনের শিকার হওয়া পরিবারটি আজ নিজেদের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুতেও মাথা গোঁজার সাহস পাচ্ছে না।

কুয়েত প্রবাসী জামাল উদ্দিন দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষ করে মাত্র কয়েক মাস আগে দেশে ফিরেছিলেন নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। কিন্তু আজ তার স্ত্রী ও সন্তানরা স্বজনদের হারিয়ে চরম মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

নিহতদের এক নিকটাত্মীয় অশ্রুভেজা চোখে এবং আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে এই প্রতিবেদককে বলেন, “যাদের চোখের সামনে নিজেদের মানুষগুলো নৃশংসভাবে খুন হলো, তারা আজ জীবন বাঁচাতে ফেরারি। খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর পুলিশ আমাদের ঘরছাড়া করে রেখেছে। এই মহিলা (নিহতের স্ত্রী) আমাদের কতটা মায়া করতেন, কত রান্না করে খাওয়াতেন! আজ তার স্বামী নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। আমরা কার কাছে বিচার চাইবো? এই দেশে কি গরিবের জন্য কোনো আইন নেই?”

মামলার এজাহার: ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা, ১৩ জনই জামায়াত নেতা

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিওসি কেছরীগুল এলাকায় সংঘটিত এই ধারাবাহিক সহিংসতা ও তিনটি পৃথক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বড়লেখা থানায় মোট ১৬ জনকে সুনির্দিষ্ট আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, আসামীদের মধ্যে ১৩ জনই স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী নেতা-কর্মী এবং বাকি ৩ জন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য।

গত ২৮ ডিসেম্বর বিকেলে, যখন বিওসি মাঠ গুদাম এলাকায় পূর্বশত্রুতার জের ধরে দুই পক্ষের বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের আসামীদের হাতে থাকা ধারালো রামদা ও লাঠিসোটা নিয়ে দুই ভাইয়ের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। মাথায় মারাত্মক জখম হওয়ায় জামাল ও কাইয়ুম ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। একই ঘটনায় প্রতিপক্ষের জমির উদ্দিন নামের একজন আহত হলে তাকে উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল সেখান থেকে পুলিশ থাকে গ্রেফতার করে। উক্ত মামলার আসামিরা হলেন- ১। কামাল আহমদ (৪০), পিতা- মৃত মতরুফ আলী, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ২। গ্রেফতারকৃত জমির আলী (৩৫), পিতা-মৃত আব্দুস ছবুর, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৩। এনাম উদ্দিন (২২), পিতা- মৃত মতরুফ আলী, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৪। তুতিউর রহমান দোয়েল (৫০), পিতা- মৃত মোদাচ্ছের আলী, সাং- বড়খলা, ৫। আব্দুল আজিজ (৩৮), পিতা- মৃত আব্দুস সুফান, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৬। সাইফুল ইসলাম (৩৫), পিতা- জয়নাল আবেদিন, সাং-বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৭। আব্দুল হামিদ (৪০), পিতা- মৃত আব্দুস শুকুর, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৮। জয়নাল আবেদিন (৫৬), পিতা- মৃত আব্দুল মজিদ, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ৯। গ্রেফতারকৃত আব্দুল আলিম (২৬), পিতা- মৃত শফিক, সাং- গৌড়নগর, ১০। নানু মিয়া (৩০), পিতা- উস্তার আলী, সাং- পানিধার, ১১। জাহেদুর রহমান (৩৩), পিতা- মৃত ইসলাম উদ্দিন, সাং-মহদিকোনা, ১২। ফয়ছল আহমদ (৩৪), পিতা- আব্দুল হক, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ১৩। আলী হোসেন (২৭), পিতা- মৃত আব্দুল মালিক, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ১৪। অহিদ আহমদ (৪০), পিতা- মৃত আকবর আলী, সাং- উত্তরভাগ (কাঠালতলী উত্তর), ১৫। আব্দুল হক (৫২), পিতা- মৃত আব্দুস শুকুর, সাং- বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম), ১৬। সমছুল ইসলাম (৩৬), পিতা-মৃত আব্দুস ছবুর, সাং- বিওসি কেছরীগুল, সর্ব থানা- বড়লেখা, জেলা- মৌলভীবাজার। গং ১০/১৫জন

নির্বাচন শেষ হলেও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় ফুঁসছে বড়লেখা :

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দেশে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন শেষ হলেও এই চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের মামলার আসামীদের গ্রেফতারে বড়লেখা থানা প্রশাসন ও স্থানীয় সিভিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো জবাবদিহিতা বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। মামলার পর দীর্ঘ ৪ মাস অর্থাৎ ১২০টিরও বেশি দিন পার হয়ে গেলেও আসামীদের একজনকেও ছুঁতে না পারা পুলিশের চরম অবহেলা, উদাসীনতা এবং পরোক্ষ পক্ষপাতিত্বকেই নির্দেশ করে। প্রশাসনের এমন রহস্যজনক নীরবতা এবং আসামীদের ক্ষমতার দাপটের কারণে পুরো বড়লেখা জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এলাকার সাধারণ মানুষ এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত।

বড়লেখা থানা পুলিশের দাবি ও বাস্তবতা :

মামলার দীর্ঘ স্থবিরতা ও আসামীদের গ্রেফতার না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান খান পূর্বের মতোই চিরাচরিত সুরে জানান, “নিহত দু’জন আপন দুই ভাই ছিলেন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের মাথায় আঘাত করা হয়েছিল এবং আমরা তাদের ঘটনাস্থলেই মৃত অবস্থায় পাই। ঘটনার পর থেকেই পুলিশ প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেফতারে কাজ করছে। আসামীদের গ্রেফতারে আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

তবে দীর্ঘ চার মাসেও কেন একজন আসামীকেও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলো না, কিংবা আসামীরা এলাকায় থাকা সত্ত্বেও কেন পুলিশ তাদের দেখছে না—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি। ওসির এই দাবি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত লক্ষ্য করা গেছে।

দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকুতি :

নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে, স্বজনদের হারিয়ে আজ ধুঁকে ধুঁকে মরছে অসহায় পরিবারটি। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো বিশেষ দলের কোটা ব্যবহার করে কেউ যেন পার পেয়ে যেতে না পারে। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক অবহেলার এই বিষাক্ত বেড়াজাল ছিন্ন করে অবিলম্বে এজাহারভুক্ত ১৬ আসামীকে দ্রুততম সময়ে গ্রেফতার করতে হবে। ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারটিকে তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটিতে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং এই বর্বরোচিত জোড়া খুনের দ্রুততম ট্রায়ালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আইনি শাস্তি (ফাঁসি) নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন মৌলভীবাজারের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ।