এ কোন বাংলাদেশ? জামায়াতের বাধায় রাত ২টায় গোপনে মুক্তিযোদ্ধার দাফন, কোদাল হাতে স্ত্রী-কন্যা!
- আপডেট সময় : ০৩:৪৮:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
এ কোন বাংলাদেশ? জামায়াতের বাধায় রাত ২টায় গোপনে মুক্তিযোদ্ধার দাফন, কোদাল হাতে স্ত্রী-কন্যা!
নিজস্ব প্রতিবেদন, খবর ধারা : স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে এর চেয়ে লজ্জার, এর চেয়ে কলঙ্কের ঘটনা আর কী হতে পারে? একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছেন, যিনি যুদ্ধাপরাধীর বিচার চেয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে সাক্ষী দিয়েছেন, তার মরদেহ ১৭ ঘণ্টা ধরে ঘুরতে হয়েছে নিজ জেলায়। শেষ পর্যন্ত রাত ২টার অন্ধকারে, অনেকটা চোরের মতো, পুলিশ পাহারায় গোপনে দাফন করতে হয়েছে তাকে। আর সেই কবর খুঁড়েছেন তার স্ত্রী, তার মেয়ে এবং তার বোন।
এই ঘটনাই প্রমাণ করে, দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কতটা বিপন্ন, আর জামায়াতের আস্ফালন কতটা ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মৃত্যু পলাতক অবস্থায়, দাফনেও বাধা
নিহত বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম মানিক পশারী (৮৭)। পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ছিলেন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান সাক্ষী।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন এই বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা। আশ্রয় নিয়েছিলেন যশোরে, পরে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে। সেখানেই গত দুই মাস ধরে অসুস্থ থেকে শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
মৃত্যুর পর মরদেহ আনা হয় তার নিজ জেলা পিরোজপুরে। দুপুর ১২টায় সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে লাশ পৌঁছালে সেখানে জামায়াতের নেতাকর্মীরা তাণ্ডব শুরু করে। জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে তারা মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে লাশ দাফনে বাধা দেয় এবং ঘোষণা দেয়, পিরোজপুরের মাটিতে তার দাফন হতে দেওয়া হবে না।
১৭ ঘণ্টা লাশবন্দি, অতঃপর গভীর রাতে দাফন
জামায়াতের বাধার মুখে পুলিশ মরদেহ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় পুলিশ লাইন্সে। সেখানে বিকেল ৫টায় তাকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। কিন্তু গার্ড অব অনার দিয়েও তাকে দিনের আলোয় কবরে নেওয়া যায়নি। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় পুলিশ লাশ ঘিরে রাখে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
অবশেষে রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশ মরদেহ নিয়ে পৌঁছায় তার নিজ বাড়ি চিতলিয়া গ্রামে। রাত ২টার দিকে সম্পন্ন হয় দাফন।
আর এই দাফনের দৃশ্য ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। জামায়াতের ভয়ে জানাজায় আসেনি কোনো পুরুষ মানুষ। স্থানীয়রা ভয়ে দূরে সরে ছিল। শেষ পর্যন্ত কোদাল হাতে কবরে নামতে হয় তার বৃদ্ধা স্ত্রী, তার মেয়ে এবং তার বোনকে।
মানিক পশারীর বোন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ভাইরে টুঙ্গিপাড়া দিয়া পিরোজপুর আনার পর ওখানে ঝামেলা হইছে। একবার মোরা কবর খুঁড়ছি, সেই কবর লোকজনে আবার ভরাট কইরা ফেলছে। আবার মোরা কবর খুঁড়ছি এবং পুলিশ লাশ আনার পরে মোরাই মাডি দিছি। কোনো পুরুষ মানুষ আয় নাই।”
একবার কবর খুঁড়ে ভরাট করে দেওয়া – এর চেয়ে বড় বর্বরতা আর কী হতে পারে? একজন মৃত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গেও এই আচরণ করতে পারে যারা, তাদের কাছে মানবতা শব্দটির কোনো মূল্য আছে কি?
জামায়াতের দ্বিচারিতা
এদিকে ঘটনার পর জামায়াতের সেই নেতা আব্দুর রাজ্জাক সুর পাল্টে বলেন, “মানিক পশারীর লাশ দাফনে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের নেতারা বাধা সৃষ্টি করেনি। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা লাশের রাজনীতি করে না।”
প্রশ্ন হলো, সকালে যিনি বললেন ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, দাফন করতে দেওয়া হবে না’, বিকেলে তিনিই বলছেন ‘আমরা বাধা দেইনি’। এই মিথ্যাচার, এই দ্বিচারিতাই কি জামায়াতের রাজনীতি? লাশ আটকে রেখে, কবর ভরাট করে দিয়ে এখন সাধু সাজার চেষ্টা করছে তারা।
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, পুলিশের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে এবং কবরের পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর পাহারা দিতে কেন পুলিশ লাগবে স্বাধীন দেশে? কেন তার স্ত্রী-কন্যাকে কোদাল হাতে নিতে হবে?
ইতিহাস ক্ষমা করবে না
মানিক পশারী ২০০৯ সালে সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন। সেই মামলায় ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড হয়, পরে ২০১৪ সালে আপিলে তা আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট কারাগারে মারা যান সাঈদী।
সাঈদী মারা গেছেন, কিন্তু তার বিচার চাওয়ার অপরাধে মানিক পশারীকে জীবনে পালিয়ে বেড়াতে হলো, মরণে ১৭ ঘণ্টা লাশ হয়ে ঘুরতে হলো।
আজ পিরোজপুরে শুধু মানিক পশারীকে দাফন করা হয়নি, দাফন করা হয়েছে রাষ্ট্রের বিবেককে, মুক্তিযুদ্ধের সম্মানকে। আর যে কোদাল দিয়ে তার স্ত্রী-কন্যা কবর খুঁড়েছেন, সেই কোদালের প্রতিটি আঘাত পড়েছে বাংলাদেশের মানচিত্রে। এই কলঙ্কের দাগ মুছবে কীভাবে?









